ঢাকা , বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ , ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসুন, চাঁদাবাজদের ধরুন

আপলোড সময় : ১২-০৩-২০২৬ ১১:৩২:৪৫ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৩-২০২৬ ১১:৩২:৪৫ পূর্বাহ্ন
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসুন, চাঁদাবাজদের ধরুন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসুন, চাঁদাবাজদের ধরুন
নিজস্ব প্রতিবেদক
‘চলেন, যুদ্ধে যাই’-তিন শব্দের এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী অনেক কিছুই বলেছেন। সমস্যাসংকুল একটি দেশ পরিচালনা যুদ্ধের চেয়ে কম দক্ষতার কাজ নয়। যুদ্ধে প্রতিপক্ষ কে বা কারা তা জানা থাকে। প্রতিপক্ষের রণকৌশল লক্ষ্য করে নিজের কৌশল নির্ধারণ করা যায়।

কিন্তু দেশ পরিচালনায় প্রতিপক্ষ বা শত্রু চেনা যায় না। শত্রু বাইরেও থাকতে পারে, ঘরেও থাকতে পারে। আধুনিক এই সময়ে নিজের ব্যবহৃত ডিভাইসও শত্রুতে পরিণত হয়। যেমন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু হয়েছে ডিভাইস অনুসরণ করে।

বাংলাদেশে সরকারি দলের শত্রু শুমার করা যায় না। প্রতি পদে শত্রু। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু দুর্বল অর্থনীতি ও চাঁদাবাজি। সেই সঙ্গে আছে মব সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্ত চক্র।

এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতি সবল করতে অতি জরুরি কাজটি হলো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসা। দ্বিতীয় জরুরি কাজটি হলো কঠোর হাতে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা। দলের উচ্ছৃঙ্খল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয় কাজটি হলো দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি ব্যবহারের আওতায় আনা। সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে। সংসদই সব গণতান্ত্রিক শক্তির ভিত্তি। এ শক্তি কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তার প্রতিদিনের, প্রতিবাদের যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রাণশক্তি হলো ব্যবসা ও কৃষি। কৃষি একসময় শুধু কৃষকসংশ্লিষ্ট ছিল। এখন খাতটি বহুমাত্রিক ব্যবসা ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। করপোরেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ডাল ভাজা, মুড়ি ভাজাও সুন্দর মোড়কে ভরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বিক্রি করছে। দেশের বর্তমান আর্থিক সংকট দূর করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে সব সেক্টরের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীকে বসতে হবে। বর্তমান সংকটে তাদের কী করা উচিত সেসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অতি জরুরি। নিত্যপণ্য নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট যেন গড়ে না ওঠে, সে বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কথাও শুনতে হবে। বাংলাদেশে কী কী কারণে ব্যবসার পরিবেশ বিঘ্নিত হয়, সেসব চিহ্নিত করতে হবে। একজন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাকে কোথায় কোথায় কিভাবে চাঁদা বা ঘুষ দিতে হয়, সেসব প্রধানমন্ত্রীর জানা উচিত। যেসব ব্যবসায়ীর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে, সেগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মাধ্যমে দেশে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বেকারত্ব দূর, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা সম্ভব না হলে স্থবির অর্থনীতি গতিশীল হবে না। ব্যবসায়ীরা কিভাবে জনকল্যাণে ব্যবসা করতে পারেন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ কিভাবে নির্ঝঞ্ঝাট করা যায়, সে ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো ব্যবসায়ী যেন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপের মুখে সরকারের মোসাহেবি করতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যে ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সরকার ব্যবসায়ীদের হাতের মুঠোয় রাখার জন্য নানাভাবে চাপের মধ্যে রেখেছিল। সরকারের পক্ষে ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতেন পতিত স্বৈরাচার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। কেউ ইচ্ছা করলেও স্বাধীনভাবে ব্যবসা করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে সব ব্যবসায়ী সালমানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতেন। তা ছাড়া বাংলাদেশ হলো এমন একটি দেশ, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ ছাড়া খুব কম মানুষই অন্যকে সাহায্য করে। কোনো শিল্পোদ্যোক্তা নিজের টাকা খরচ করে কোনো একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নিলে তাঁকে অনেক সার্টিফিকেট জোগাড় করতে হয়। দেশিবিদেশি ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের সহায়তার জন্য বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোসহ বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান আছে। সব প্রতিষ্ঠানেরই স্লোগান-‘এক ছাতার নিচে সব সেবা’। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। যেমন কেউ যদি একটি টেক্সটাইল মিল করতে চান, তাহলে তাকে প্রথমে জমি কিনতে হবে। জমি কিনতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টাকা ছাড়া এ অনুমতি মেলে না। জমি কেনা শুরু করতে হয় স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বা ব্যক্তির মাধ্যমে। এর জন্য অযৌক্তিকভাবে অতিরিক্ত টাকা খরচ হয়। জমি কেনা ও মাটি ভরাটের জন্য স্থানীয় মস্তানদের কাজ অথবা চাঁদা দিতে হয়। এরপর নিতে হয় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ। টাকা ছাড়া বিদ্যুৎ-গ্যাসের অফিস কাজ করে না। গ্যাস সংযোগের জন্য শুধু টাকা দিলেও হয় না, দরকার হয় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন। এ ক্ষেত্রেও লাগে টাকা, না হয় ক্ষমতাবান কোনো মন্ত্রী বা সচিবের সুপারিশ। সেজন্যও টাকা লাগে। পরিবেশের ছাড়পত্র, ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্রসহ যত ধরনের ছাড়পত্র লাগে, সব ক্ষেত্রেই টাকা অথবা জোরালো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। তারপর আছে ব্যাংক ঋণের পালা। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলে ব্যাংক ঋণও মেলে না। তাই বিনিয়োগকারীরা বাধ্য হয়ে সরকারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। আর সে কারণেই পরবর্তী সময়ে ব্যবসায়ীদের সাবেক সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। বিগত সময়ে দেশে ছোটবড় এমন কোনো ব্যবসায়ী নেই, যিনি ব্যবসা রক্ষার স্বার্থে সরকারের সঙ্গে সখ্য রাখতে বাধ্য হননি। কেউ প্রকাশ্যে ছিলেন, কেউ ছিলেন অপ্রকাশ্যে। কেউ নেত্রীকে খুশি করেছেন, কেউ ছোটবোনকে, কেউবা আবার মামাকে খুশি করেছেন। কাউকে না কাউকে খুশি না করে আওয়ামী লীগ আমলের ১৬ বছরে বাংলাদেশে ব্যবসা করতে পারেননি কেউ। আবার সেজন্যই এখন অনেককে ওই সরকারের দালাল বা দোসর তকমা পেতে হচ্ছে। কিন্তু যদি ব্যবসা করার জন্য কাউকে খুশি করার প্রয়োজন না হতো, তাহলে এমন পরিবেশ সৃষ্টি হতো না। এখন নতুন সময়। নতুন স্বপ্ন। তাই সরকারের উচিত ব্যবসায়ীরা কীভাবে স্বাধীন ও ঝামেলামুক্ত পরিবেশে ব্যবসা করতে পারেন সেজন্য যা যা দরকার, তা করা।

আমাদের অর্থনীতিতে কৃষি সেক্টরটি বড় অবদান রাখছে। অনেক সময়ই কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। তীব্র মনঃকষ্টে গরুর দুধ, খেতের টম্যাটো বা আলু রাস্তায় ফেলে কৃষক প্রতিবাদ করেন। কারণ কৃষক জানেন মাটিতে ফসল ফলাতে কতটা কষ্ট করতে হয়। শরীর থেকে কী পরিমাণ ঘাম ঝরে তা একমাত্র কৃষকই জানেন। কৃষিপ্রধান দেশে কৃষক ও কৃষি বাঁচলেই দেশ বাঁচে। ১ কেজি কাঁচা মরিচের দাম যখন ৩০০-৪০০ টাকা, ১ হালি লেবু যখন ১৫০ টাকা হয়ে যায়, তখন কৃষককে মনে পড়ে। যদিও এর কিছুই কৃষকের ভাগ্যে জোটে না। মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেট এ অবৈধ মূল্যবৃদ্ধির গোটা ফায়দা লুটে নেয়। পকেট কাটা যায় ভোক্তার। তাই কৃষককে সারা বছরই মনে রাখতে হবে। কার্যকরভাবে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এক জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসল ফলানোর পদ্ধতি ইতোমধ্যে আমাদের কৃষক রপ্ত করতে পেরেছেন। উন্নতমানের বীজ বা ফসল উৎপাদনের প্রযুক্তি আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। কৃষি নিয়ে নতুন নতুন গবেষণাও হচ্ছে। বড় বড় করপোরেট ব্যবসায়ী এখন কৃষিতে বিনিয়োগ করছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশে কৃষিবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন খাল খননের মাধ্যমে। দেশের অনাবাদী জমিগুলো আবাদের আওতায় আনার জন্য তিনি কৃষি সেক্টরে অনেক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়াও একইভাবে কৃষিতে অবদান রেখেছিলেন। তাঁদেরই সন্তান তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে এখন সমন্বিত কৃষিতে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু কৃষক নয়, কৃষকের গোটা পরিবারকে বাঁচাতে হবে। কৃষক পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। প্রতি ইঞ্চি জমির সঠিক ব্যবহার করতে হবে। যেসব জমি অব্যবহৃত পড়ে আছে, সেগুলো চাষাবাদের আওতায় আনতে হবে। রাজউক বা বিভিন্ন হাউজিং প্রকল্পে যারা প্লট বরাদ্দ পেয়েছেন বা জমি কিনেছেন, সেসব জমি বছরের পর বছর পড়ে আছে। ওইসব জমিও যেন পড়ে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি বছর নদীপারের অনেক জমি বিলীন হয়ে যায়; আবার কোথাও চর জেগে ওঠে। ওইসব চরের জমিও আবাদের আওতায় আনতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিদিনই যুদ্ধযাত্রা করছেন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বা ইশতেহার ধরে ধরে একের পর এক কাজ করছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদানের কাজটি তিনি ১০ মার্চ মঙ্গলবার উদ্বোধন করেছেন। প্রথম দিনে ৩৭ হাজার নারীকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। আগামী মাস থেকে দেওয়া হবে কৃষক কার্ড। রাজধানীর বনানীতে কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে সারা দেশের ১৪ স্থানে একযোগে এ কার্ড বিতরণ শুরু হয়। এর মধ্যে রাজধানীর কড়াইল, সাততলা ও ভাসানটেক বস্তি এলাকার ১৫ হাজার নারী ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। যে নারী এই কার্ড পেয়েছেন, তিনি হাত তুলে প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করেছেন। কিন্তু যদি এসব বস্তিতে দখলবাজি হয়, চাঁদাবাজি হয় তাহলে এই নারীরাই আবার হাত তুলে সরকারের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে নালিশ জানাবেন।

বিগত ১৮ মাস দেশের মানুষ মব সন্ত্রাসে অতিষ্ঠ ছিল। ছাত্রের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হয়েছেন। তরুণের হাতে প্রৌঢ় অপমানিত হয়েছেন। নারী-শিশুর নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারকে যুদ্ধে বিজয়ী হতে হলে সন্ত্রাসী বা চাঁদাবাজ যে দলের বা মতেরই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না।  সরকারদলীয় কোনো কর্মীর বিরুদ্ধেও সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেলে শাস্তি আরও কঠিন হতে হবে। দল থেকে বহিষ্কার বা শোকজ কোনো সাজার পর্যায়ে পড়ে না। এটা বরং পরবর্তীতে আরও বড় পদ পাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। সেজন্য জনগণ একে লোকদেখানো পদক্ষেপ বলে মনে করে। সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজি নির্মূল করতে না পারলে যুদ্ধে জয় সহজ হবে না। মোট কথা, তারেক রহমানকে যুদ্ধে জয়ী হতে হলে ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসতে হবে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নির্মূল করতে হবে। প্রতি ইঞ্চি জমির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কোনো কার্ডেই কাজ হবে না।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : NewsUpload

কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ